আজ পবিত্র মি’রাজের রাত। ২৭ রজবের আগের রাতে প্রিয়নবী সা: এর জীবনে এবং মুসলিম উম্মতের ইতিহাসের এক অসাধারণ ঘটনা।
শত শত বছর পর আজ মক্কা এক জমজমাট আলোক উজ্জল শহর। যে শহর কখনো ঘুমায় না। ভাবতে চেষ্টা করছি সে রাতে কেমন ছিলো মক্কা ও কাবার আশপাশ।
ঐ বছরটা নি:সন্দেহে কঠিনতম একটা সময় ছিলো মুহাম্মদ সা: এর জীবনে। প্রায় বারো বছর যাবত মক্কার লোকদের দাওয়াত দিয়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। এত বিদ্রুপ, ঠাট্টা আর নির্যাতনও সহ্য করতে হয় ভালো লোকগুলোকে! তিন বছরের অবরোধের পর আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসা। তায়েফে দাওয়াত দিতে গিয়ে চরম অপমান আর কষ্টের মুখোমুখি হওয়া। হয়তো সর্বশ্রেষ্ঠ আর আশাবাদী মানুষটাও কষ্টে হতাশায় কিছুটা দমে গিয়েছিলেন।
তিনি ছিলেন নিষ্পাপ, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত তো অবশ্যই। জান্নাতের দরজা প্রথম খুলে ভেতরে ঢুকবেন তিনি। তবুও গভীর রাতে ঘুম বাদ দিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন। কান্নাকাটি করতেন। সবাই যখন ঘুমাচ্ছে এমন নিশুতি রাতে উঠে বের হলেন অজু করার জন্য। অজুরা পানি ঢালতে যাচ্ছেন, ফেরেশতা এসে নিয়ে গেলেন তাকে মহান প্রভুর কাছে। যে পরম শক্তিশালী স্বত্তার জন্য পৃথিবীর সব স্বার্থ তুচ্ছ করেছিলেন, সেই মহান বন্ধুর সাথে সরাসরি দেখা করা নিশ্চয় মুহাম্মদ সা: এর জীবনে বিশাল পরিবর্তন এনেছিলো। অহী অবতীর্ণ হওয়া আরম্ভ হবার ঘটনার পর এত গভীর তাৎপর্যময় ঘটনা আর নেই সম্ভবত।
প্রথমে যান জেরুজালেমে। বায়তুল মাকদাসে। কসাই জায়নবাদীদের দখলে বায়তুল মাকদাস আর মসজিদ আকসা আজ কাঁদছে। ওখানে আদিঅন্ত সব নবী রাসুলদের জামায়াতে নামায ইমামতি করেন তিনি। তারপর আকাশপানে যাত্রা। জান্নাত জাহান্নাম দেখা, আল্লাহর সাথে দীদার। রাসুল সা: নিজ মানবীয় শরীর নিয়েই গিয়েছিলেন, স্বচক্ষে আল্লাহ তায়ালাকে দেখেছেন। এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের এবং মেইনষ্ট্রিম সব মুসলিমদের আকীদা-বিশ্বাস। এটা কোন মানসিক ভ্রমণ বা ধ্যান ছিলো না। ওরিয়েন্টালিষ্টরা বলতে চায়, এটা ছিলো তাঁর মোহ, হ্যালুসিনেশান। কেউ কেউ বলে, মিরাজের ঘটনা গ্রীক এক গল্পের বিবর্তন। বলুক, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ দেখান আর যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। তা আমার চিন্তার বিষয় না।
লক্ষ কোটি আলোকবর্ষের চেয়ে বেশি, মানুষের পরিমাপের ক্ষমতার বাইরে দুরত্ব পেরিয়ে আল্লাহ তায়ালার সাথে দেখা করে যখন তিনি ফিরে আসেন মক্কায় নিজ বাড়ির সামনে, যেখানে দাড়িয়ে অজু করছিলেন। অজুর সময় ঢেলে দেয়া পানিটুকু তখনো গড়াচ্ছে। ঘরের ভেতর স্ত্রী ঘুমাচ্ছেন, সারা মক্কা শহর ঘুমাচ্ছে।
সকালে সবাই আনন্দে ফেটে পড়লো। এতদিন বলতাম মুহাম্মদ পাগল, আজ বাস্তব প্রমাণ পাওয়া গেলো। এমন ঘটনাও কি সম্ভব, এমন কথা যে বলে সে পাগল না তো পাগল কে? কিন্তু আবু বকর নির্বিকার, যদি মুহাম্মদ সা: বলে থাকেন, তাহলে তাই হয়েছে। এতে সন্দেহের কি আছে? সেই থেকে আবু বকর পরিচিত হলে সিদ্দীক নামে, সত্যবাদী নামে।
আমি ভাবতে চেষ্টা করছি, প্রিয়নবীর মন সেই মেরাজের পর কতটা তৃপ্ত সমর্পিত ছিলো। মুসলিমদের জন্য ছিলো পরীক্ষা, যাদের ঈমান দুর্বল তারাও কিছুটা ধন্দে পড়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বাস যতদূর যায়, যুক্তি তার অনেক আগেই থেমে যায়। মিলি সেকেন্ডের ভেতর পৃথিবীর বয়সকাল বা তারো বেশি দুরত্ব ঘুরে আসা কিভাবে সম্ভব তা মানুষের বোধের বাইরে।
আমাদের দেশে সামাজিক ভাবে আমরা ইসলামকে সেলিব্রেশন করি না। মুসলিম নামমাত্র, জুমা পড়ি, ভালো হলে নিয়মিতও নামায পড়তে চেষ্টা করি। অন্য দেশে দেখেছি লায়লাতুল মিরাজকে তারা নিজেদের সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে নিয়েছে। এ রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়ে পরিবারের সবাই মসজিদে গিয়ে। রাতে মসজিদগুলোতে ইসলামিক বক্তব্যের অনুষ্ঠান থাকে। কোন হুজুর লম্বা টান দিয়ে আকাশ বাতাসের গল্প করে আসর জমান না। বরং একজন ভালো আলেম ইসলাম নিয়ে, হয়তো মিরাজ উপলক্ষে এ বিশেষ প্রসঙ্গে নিজের কথাগুলো চারপাশের সমাজের সাথে মিলিয়ে সবার সামনে বর্ণনা করেন। স্বামী স্ত্রী ছেলে মেয়ে সবাই চুপচাপ মন দিয়ে শোনে, চিন্তা করে। নিজ জীবনকে চিন্তাকে আরেকটা রিষ্টার্ট দেবার চিন্তা করে।
আমাদের সমাজে বয়স্করা চুপচাপ আবুল তাবুল গানমার্কা সুরেলা ওয়াজ শোনে। শিশুরা পিছনদিকে আর বাইরে দৌড়াদৌড়ি করে। আমার বয়সীরা মোবাইলে এসএমএস লিখে ব্লুটুথে ফাইল ট্রান্সফার করে আর নীচুস্বরে গল্প করে।
ওরা যখন ইমাম সাহেবের বক্তৃতা শেষে কোরআন পড়ে, ইসলামিক বই পড়ে কিংবা শেষ রাতের নামায আর সাহরীর জন্য প্রস্তুতি নেয়, আমরা তখন জিলাপি খেয়ে বাসায় এসে ডিশে কিছুক্ষণ ছাইয়া ছাইয়া দেখি, ইন্টারনেটে ব্রাউজ করি। ফজরের নামায? খিক খিক।
“অন্ধকার সরণী ধরে শেষ হবে এ পথ চলা”। অন্ধকার আজব পথে চলা শেষ হতে হবেই। কয়েক প্রজন্ম পরে হোক, হতাশা নেই। আশার আলোটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। কত হতাশা আর কষ্টের পরও প্রিয়নবী এবং তাঁর সাহাবীরা নিরাশ হয়ে সব ছেড়েছুড়ে দেননি, আমাদের কি যুক্তি আছে নিরাশায় হারানোর? আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ। এই পবিত্র রজনীতে সেই শ্রেষ্ঠ মানুষকে স্মরণ করছি। আল্লাহ, আমাদের আপনি সঠিক পথ দেখান।
No comments:
Post a Comment