Showing posts with label জামায়াত. Show all posts
Showing posts with label জামায়াত. Show all posts

Friday, July 16, 2010

জামায়াত নেতাদের গ্রেফতার ও গণমাধ্যমের প্রত্যাশিত ভূমিকা

জামায়াত নেতাদের গ্রেফতার ঘটনায় পত্রপত্রিকার অবস্থা ও অবস্থান দেখে অবাক লাগছিলো। তাই কিছুমিছু একটা লিখে সোনারবাংলাদেশ আর নয়াদিগন্তে পাঠিয়েছিলাম। কয়েকদিনে সেখানে ছাপা না হওয়ায় পরে তা সেরীন ফেরদৌস আর শওকত আলী সাগরের অনলাইন পত্রিকা (কানাডা থেকে প্রকাশিত) নতুনদেশে মেইল করেছিলাম। লেখালেখির অভিজ্ঞতা না থাকাতে জানি না একই লেখা কয়েক জায়গায় পাঠানো এথিকালি ঠিক কি না। একাডেমিক জার্ণাল হলে ঠিক না, কিন্তু এটা তো পাবলিক মিডিয়া। যাইহোক, আজ দেখলাম নতুনদেশ এটা প্রকাশ করেছে। তাদেরকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ।

এটা অবশ্য ব্লগ হিসেবে পড়তে মজাদার হবে বলে মনে হচ্ছে না। আমার টুকটাক লেখালেখির অভ্যাসটা একটু অন্যরকম। একটানে লিখে ফেলি, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও পরে এডিট করার জন্য পড়তে মন চায় না। এটা বদলানো দরকার। এখন আবার পড়ে মনে হচ্ছে একটু ভারী ভারী হয়ে গেছে। আরেকটু সহজ হলে ভালো হতো। যাইহোক, এখানেও জমা করে রাখি। শুরু-

-------------------

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদেরকে গ্রেফতার এবং দীর্ঘ সময় রিমান্ডের ঘটনায় সাধারণ জনগণ, রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি এবং বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ আনন্দিত, কেউ দু:খিত আবার অনেকেই নির্বিকার। এর মাঝে গণমাধ্যম, বিশেষ করে পত্রিকাগুলোর প্রতিক্রিয়া সচেতন পাঠকরা খেয়াল করেছে। নিরপেক্ষ সৎ সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা একটি ন্যায়পরায়ন সমাজ কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে অনেকেই কিছুটা হতচকিত, জাতির বিবেক নামে অভিহিত সাংবাদিকদের কাছ থেকে যে নিরপেক্ষতা আশা করা হয়, তা উপেক্ষা করে কেউ কেউ যেন রাখঢাক ছাড়াই পক্ষপাতমূলক প্রচারে নেমে পড়েছেন।

পত্রিকায় কোন ঘটনার নিরপেক্ষ খবর থাকাটা প্রত্যাশিত। কিন্তু জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারের পর অনেকে বর্ণনামূলক প্রতিবেদনের সিরিজ প্রকাশ করে চলেছেন, যার পরোক্ষ কিন্তু মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ জনগণের চিন্তা ও মতামতকে প্রভাবিত করা। পুলিশের হাজতখানায়, জেলখানায় এবং রিমান্ডে কি হচ্ছে তার রসালো বর্ণনা দেখা যাচ্ছে অনেক পত্রিকায়।

অপপ্রচার এবং ভিকটিমদের চরিত্রহননের এ উপায় উদ্ভাবন করেছিলো এক এগারো পরবর্তী সরকার। জনসাধারণের মতামতকে প্রভাবিত করার জন্য এবং মনযোগ সরিয়ে রাখার জন্য সে সময় রাজনীতিবিদদের স্বীকারোক্তি আর রগরগে কাহিনী প্রচার করা হতো পত্রিকাগুলোতে। পুলিশের হেফাজতে থানাহাজত বা রিমান্ডে কি হয়, তা যেমন সংবিধানসম্মত মানবিক হওয়া উচিত, একই সাথে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তার গোপনীয়তাও দরকারী। কিন্তু আদালতে বিচারের আগেই গণমাধ্যমে বিচার কাজ সেরে ফেলার জন্য পুলিশ-সাংবাদিকের সখ্যতার সুচনা করেছিলো ঐ সরকার। নির্বাচিত সরকারের সুযোগ ছিলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার, কিন্তু সেই পুরনো খারাপ নজীর বর্তমান সরকারও যেন অনুসরণ করে চলেছে। বরং তা এক কাঠি আগে বেড়ে আরো সরেস হয়েছে।

গত কয়েকদিনের রিপোর্ট গুলো পর্যালোচনা করলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পত্রিকাগুলোতে যে অভিযোগের আঙ্গুল তোলা হচ্ছে পরদিন জিজ্ঞাসাবাদে সে প্রসঙ্গে পুলিশ জোর দিচ্ছে। জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খানের একটা স্বাভাবিক বক্তব্যকে বিকৃত করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যে প্রপাগান্ডার বন্যা শুরু হয়েছিলো, এখনো অনেক পত্রিকা সে প্রচারের ধারা থেকে বের হয়ে নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বিভিন্ন পত্রিকায় একটা ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যেখানে পুলিশ অফিসারের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, থানাহাজতে একজন খুনের আসামী আলী আহসান মুজাহিদকে গালিগালাজ করছেন, মুজাহিদও তার সাথে পাল্টা ঝগড়া করছেন। প্রতিবেদনের ভাষা এবং ভঙ্গিতে একজন সাধারণ পাঠকের মনে হতে পারে, জামায়াত নেতারা এতই ঘৃণিত যে কুখ্যাত অপরাধীরা তাদের চেয়ে ভালো মানুষ। মাওলানা সাঈদীর সাথে কেউ থাকতে অস্বীকার করাতে তাকে মহিলা হাজতখানার খালি কক্ষে রাখতে হয়েছে, এমন খবরও পত্রিকায় এসেছে। এর কদিন পরে আরেকটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে, যেখানে মাওলানা নিজামীর পেছনে নামায পড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে এক কয়েদী জেএমবি সদস্য কি কি গালিগালাজ করেছে তার বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রথমত, রাজনৈতিক দলের নেতারা সাধারণত অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর জনপ্রিয়তার পর নেতৃত্বের পর্যায়ে যান। তারা ভালোভাবে জানেন, সাধারণ মানুষের সাথে কিভাবে ব্যাবহার করতে হয়। তদুপরি, একটি আদর্শবাদী দলের নেতাদেরকে আরো উন্নত চরিত্রের হতে হয়। ইতিহাসে অনেক উদাহরণ আছে একজন ভালো মুসলিমের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখে অন্যায়কারী মানুষের বদলে যাওয়ার। ইসলাম চর্চাকারী এবং ইসলামী দলের নেতা পর্যায়ের এমন মানুষরা হাজতখানায় সমাজের অপরাধী অংশের সাথে হাতাহাতি ঝগড়া করছেন, এমনটা শুনলে একটু খটকা লাগে।

এ ধরণের বর্ণনামুলক খবরগুলো কয়েকটি পত্রিকায় একসাথে পড়লে কয়েকটা বিষয় চোখে পড়ে। কখনো কখনো দুই তিনটি পত্রিকার রিপোর্ট দেখা যায় হুবহু একই রকম, একই লেখা একের অধিক পত্রিকায় আসে। তখন পাঠকের এটা ধারণা করার যথেষ্ট অবকাশ থাকে যে এটা একটা সিন্ডিকেটেড প্রচারণা। আবার কখনো কখনো এর উল্টোটা ঘটে। যেমন হাজতখানায় নামাযে মাওলানা নিজামীর ইমামতি প্রসঙ্গে দুটি স্বনামধন্য পত্রিকার রিপোর্টে সম্পুর্ণ বিপরীত ঘটনা লেখা হয়েছে।

ছয় জুলাই জনকণ্ঠ রিপোর্ট করে,দাগী অপরাধী হাজতিরা কেউ জামায়াত নেতাদের পিছনে নামায পড়তে রাজি হয়নি। কেবলমাত্র জঙ্গী সংগঠন জেএমবির উঁচু পর্যায়ের নেতা সৈকত তাদের পেছনে নামায পড়তে রাজি হয়েছে। এ প্রতিবেদনে মাধ্যমে পাঠকের মনে যে বার্তা পৌছে তা হলো জামায়াত যারা করেন তারা এতই খারাপ যে তাদের পেছনে নামায পড়তেও সাধারণ মুসলিমরা আপত্তি জানাচ্ছেন। একইসাথে জামায়াতের সাথে জঙ্গী সন্ত্রাসী সংগঠন জেএমবির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে পর্দার আড়ালে, যা বুঝা যায় জেএমবি সদস্যদের তাদের সাথে একসাথে নামায পড়ার ঘটনাতে।

একই দিনে সমকাল রিপোর্ট করে, জেএমবি সদস্য সৈকত জামায়াত নেতা নিজামীর ইমামতিতে নামায পড়তে রাজি হয়নি। অন্য আসামীরা তাঁর সাথে নামাযে দাড়ালেও সৈকত তাকে ভন্ড ক্ষমতালোভী আখ্যা দিয়ে আলাদা নামায পড়ে। এখানে দেখা যায়, অপরাধী হাজতিরা মাওলানা নিজামীর সংস্পর্শে এসে নামায পড়ছেন। উপরন্তু, জামায়াত এবং জেএমবির আদশর্গত মৌলিক বিরোধ প্রকাশ করেছে এ বর্ণনাটি। দুটি ঘটনার যে কোন একটা সত্য হবে, একই সাথে এ দুটি ঘটনা সত্য হতে পারেনা।

তবে প্রতিবেদন দুটি সম্পুর্ণ বিপরীতধর্মী হলেও একটি বার্তা দুই প্রতিবেদনেই আছে। ঘটনাগুলো পড়ে পাঠক মনে করতে পারেন, বাংলাদেশের হাজতগুলো যেন এক একটি মসজিদ, হাজতিরা নিয়মিত ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল হয়ে হাজতে দিন কাটায়। এমন পরিবেশে যেখানে নিয়মিত নামায পড়তে পড়তে অপরাধী হাজতিরা পুণ্যের থলে ভারি করে ফেলছেন, তারা কুখ্যাত জামায়াত নেতাদের সাথে নামায পড়ে গুনাহগার হতে চাননি, বরং তাদের ইবাদতের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য পুলিশী হাজতে বসেও বয়কটে ঝাপিয়ে পড়েছেন। সেলুকাস, কি বিচিত্র অবস্থা।

এভাবে গণমাধ্যমগুলোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন, বিরোধী দল সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি ঘটনায়। জামায়াত নেতারা গ্রেফতার হবার পরপরই খবর পরিবেশনের সময় একটি সংবাদমাধ্যমের ভাষা ছিলো বিকালে মহানগর মুখ্য হাকিম আদালত এক আদেশের পর মৌলবাদী রাজনৈতিক দলটির আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও নায়েবে আমির মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জামায়াতে ইসলামী একটি বৈধ রাজনৈতিক দল। এভাবে কি সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচলিত অন্য কোন রাজনৈতিক দলকে অভিহিত করে বা করবে? এধরণের ভাষার মাধ্যমে পাঠকদের মতকে ধীরে ধীরে প্রভাবিত করা হয়, একপর্যায়ে গিয়ে অবৈধ কোন কাজকেও পাঠক আর অস্বাভাবিক মনে করেনা। কিন্তু জাতির বিবেক গণমাধ্যমগুলো যদি এমন পক্ষপাতি ভূমিকা পালন করে, তাহলে কোন ধরণের অন্যায়ের শিকার একপক্ষের জন্য তা হবে মর্মান্তিক, এবং সামষ্টিক ভাবে দেশে সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিরাট অন্তরায়।

এ ধরণের প্রচারণার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো জনগণের মনন-চিন্তায় ঘৃণার বিষ ঢুকিয়ে দেয়া। যে উদ্দেশ্য সাধনের বড় অস্ত্র হলো অপপ্রচার এবং আমরা তা আমাদের গণমাধ্যম থেকে আশা করিনা। জামায়াত নেতাদেরকে হাজতী অপরাধীরা ঘৃণা করেন এ কথা একজন পাঠকের অবচেতনে থেকে যাবে। নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার নীতি লংঘন করে অপপ্রচারের জন্য কেউ শাস্তি পাবেনা, কিন্তু ভিকটিম জামায়াত নেতাদের যে মানহানি হলো, তারও কোন প্রতিকার হবে না। চিন্তার বিষয় হলো, কোন অন্যায়ের প্রতিকার না করে যদি ক্রমাগত লালন করা হতে থাকে, সে অন্যায়ের স্বীকার ভবিষ্যতে প্রশ্রয়দানকারীরাও হন, ইতিহাসে এর অনেক উদাহরণ দেখা যায়।

বাংলাদেশ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি ক্রান্তিকাল পেরোচ্ছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনও অনেক দূরের লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাত যেমন ভয়ংকর ক্ষতিকর হয়ে দাড়াবে, পক্ষান্তরে তাদের দায়িত্বশীল ভুমিকা দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মৌলিক একটি নিয়ামক হতে পারে।

http://www.notundesh.com/motmotantor_news4.html